তিস্তায় উজানের ঢলে বন্যা: দ্বিতীয় তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন

রোববার বিকেল থেকে তিস্তার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং রাতের দিকে তা বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সোমবার সকালে পানি কিছুটা কমলেও নিচু এলাকার বহু পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার নদী তীরবর্তী অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু রক্ষা বাঁধে নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ঢল ও বৃষ্টির পানিতে উপজেলার কোলকোন্দ, আলমবিদিতর, নোহালী, গঙ্গাচড়া সদর, লক্ষীটারী ও মর্ণেয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে বাগডহরা, মিনারবাজার, আনন্দবাজার, বিনবিনা, চর মটুকপুর, চিলাখাল, বাগেরহাট, চর শংকরদহ, কাশিয়াবাড়ী, ইচলি ও চর ছালাপাকসহ বিভিন্ন গ্রামের শত শত ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে ওই অঞ্চলের মানুষ বিশুদ্ধ খাবার পানি, খাদ্য ও তীব্র বাসস্থান সংকটে পড়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, রোববার বিকেল থেকে তিস্তার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং রাতের দিকে তা বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সোমবার সকালে পানি কিছুটা কমলেও নিচু এলাকার বহু পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে বন্যার পানির তীব্র স্রোতে গঙ্গাচড়ার মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু রক্ষা বাঁধে আবারও বড় ধরনের ভাঙন শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর ভাঙনের পর সেখানে কোনো স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করে অস্থায়ীভাবে বাঁশের পাইলিং করা হয়েছিল। যা সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং সরকারের ১৪ লাখ টাকা অপচয় হয়েছে। চলতি মৌসুমের প্রথম বন্যার পানির চাপ ও তীব্র স্রোতেই সেই দুর্বল কাঠামোটি ভেঙে গেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর ফলে দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু, রংপুর–কাকিনা আঞ্চলিক সড়ক এবং আশপাশের কয়েক হাজার মানুষের বসতভিটা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
চর শংকরদহ গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম জানান, রাতারাতি পানি বাড়ায় তাদের ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। এখন পানি কিছুটা কমলেও নদীভাঙনের কারণে তারা ভিটেমাটি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা গৃহবধূ রহিমা বেগম জানান, শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে তারা অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন এবং এখনো কোনো সরকারি ত্রাণ পাননি। কোলকোন্দ এলাকার কৃষক সালাম উদ্দিন জানান, তার দেড় একর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং আমন ধানের বীজতলা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গবাদিপশুর খাদ্য নিয়েও চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
লক্ষীটারী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, "নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গত বছর থেকে বরাদ্দের কথা শুনলেও কোনো স্থায়ী কাজ হয়নি। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে করা ১৪ লাখ টাকার বাঁশের পাইলিং প্রথম পানির চাপেই ধ্বংস হয়ে গেছে।"
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন জানান, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২০ হেক্টর আমন ধান, ১ হেক্টর মাসকলাই, ২ হেক্টর বীজবাদাম ও আধা হেক্টর সবজির জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে।
সেতু রক্ষা বাঁধের ভাঙনের কারণ অনুসন্ধান ও করণীয় নির্ধারণে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ঢাকা থেকে এলজিইডির একটি ঊর্ধ্বতন দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার এবং উপজেলা ত্রাণ কর্মকর্তা সজিবুল করীম জানিয়েছেন, প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং দ্রুত সরকারি সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হবে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু সাময়িক ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসন এবং তিস্তা নদীর ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।
এএস/
মন্তব্য করুন
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!