সম্পাদকীয়

টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত রূপান্তর: সুফল ঘরে তোলার চ্যালেঞ্জ

রুহুর আমিন সরকার ২৪ জুন, ২০২৬ এ ০৪:১৭ PM ১০৭১০৭২৪ জুন, ২০২৬
শেয়ার:
টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত রূপান্তর: সুফল ঘরে তোলার চ্যালেঞ্জ

একটি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং সুপরিকল্পিত উন্নত অবকাঠামো। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ অবকাঠামোগত উন্নয়নে যে যুগান্তকারী সাফল্য দেখিয়েছে, তা আজ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে গভীরভাবে দৃশ্যমান। পদ্মা বহুমুখী সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্পগুলো কেবল ইট, বালু আর সিমেন্টের বিশাল কাঠামো নয়; এগুলো আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির নতুন স্মারক। তবে অবকাঠামোর এই অভূতপূর্ব দৃশ্যমান উন্নয়নকে কীভাবে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করা যায় এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে এর সুফল প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।

অর্থনীতিবিজ্ঞানের চিরায়ত নিয়মানুযায়ী, অবকাঠামো হলো যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ‘রক্তবাহী ধমনী’। যোগাযোগ ব্যবস্থা যত দ্রুত, আধুনিক ও সহজ হবে, ব্যবসার খরচ (Cost of Doing Business) তত হ্রাস পাবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থার সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) তত গতিশীল হবে। উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানীসহ প্রধান বন্দরগুলোর সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। এর ফলে কৃষিপণ্য পরিবহনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমছে, পচনশীল পণ্যের অপচয় হ্রাস পাচ্ছে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণে তা ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখছে। একইভাবে, ঢাকার বুক চিরে চলে যাওয়া মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে রাজধানীর চিরচেনা যানজট নিরসন করে প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মঘণ্টা সাশ্রয় করছে, যার পরোক্ষ আর্থিক মূল্য আমাদের জাতীয় জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

কিন্তু সম্পাদকীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মনে রাখা জরুরি যে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণই উন্নয়নের শেষ কথা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই নিশ্চিত হবে, যখন এই উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। সরকার সারাদেশে যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে হবে। সেখানে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং দক্ষ লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে মেগা প্রকল্পগুলোর পেছনে হওয়া বিশাল বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক রিটার্ন বা লভ্যাংশ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অবকাঠামোর এই সুফল যেন কেবল বড় শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SMEs) বৈশ্বিক বাজারে যুক্ত হওয়ার পথ সুগম করে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে চলমান মুদ্রাস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিলে আমাদের এখন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করতে হবে। যেকোনো নতুন বড় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এখন ‘ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ’ (Cost-Benefit Analysis) এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা কঠোরভাবে মেনে চলা প্রয়োজন। অতীতে অনেক প্রকল্পের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সঠিক সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে এই ধরনের দীর্ঘসূত্রতা সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। উন্নয়ন টেকসই করতে হলে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের সক্ষমতা ও স্থায়িত্বের (Debt Sustainability) ওপর সর্বোচ্চ সতর্ক নজর রাখা আবশ্যক।

পাশাপাশি, ভৌত অবকাঠামো (রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর) উন্নয়নের সমান্তরালে আমাদের ‘ডিজিটাল ও লজিস্টিক অবকাঠামো’ এবং ‘মানবসম্পদ’ উন্নয়নে সমভাবে জোর দিতে হবে। ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলিউশন বা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কেবল অবকাঠামো দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়, যদি না আমাদের জনশক্তিকে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা যায়। দক্ষ জনশক্তি ছাড়া উন্নত অবকাঠামোর পূর্ণ সুবিধা ভোগ করা অসম্ভব। একই সাথে দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করা এবং রাজস্ব আদায়ের পরিধি (Tax-to-GDP ratio) বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। আর্থিক খাতের সংস্কার ছাড়া কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানোর লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে।

অবকাঠামোগত দৃশ্যমান উন্নয়ন আমাদের জাতীয় আত্মবিশ্বাসকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এখন সময় এসেছে এই মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার। দুর্নীতি প্রতিরোধে শূন্য সহনশীলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং দূরদর্শী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কেবল আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারব। আমরা আশা করি, সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা অবকাঠামোর এই বিশাল বিনিয়োগকে দেশের প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে রূপান্তর করতে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আরও জোরালো, সমন্বিত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেবেন।

লেখক:-

রুহুর আমিন সরকার

লেখক, সাংবাদিক ওসমাজ সেবক

এএস/

মন্তব্য করুন

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

Published২৪ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

খবর পাঠান

আপনার এলাকার সংবাদ আমাদের পাঠান

এখনই পাঠান