সারা দেশ খুলনা
অভাবনীয় সাফল্য!

সাতক্ষীরায় মাছের ঘেরের আইলে সবজি চাষে সবুজ বিপ্লব

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ১১ আগস্ট, ২০২৬ এ ১১:১৩ AM ১৫১৫১১ আগস্ট, ২০২৬
শেয়ার:
সাতক্ষীরায় মাছের ঘেরের আইলে সবজি চাষে সবুজ বিপ্লব

চিংড়ি চাষের জন্য পরিচিত সাতক্ষীরায় এখন মিঠাপানির মাছের ঘের ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন সম্ভাবনা। মাছের ঘেরের আইল ও মাচা পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

কৃষকদের কাছে ‘সাথী ফসল’ হিসেবে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ এখন লাভজনক কৃষি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। চলতি বছর জেলায় ৮৭৫ হেক্টর ঘেরের আইলে সবজি চাষ হয়েছে এবং প্রায় ১৬ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় মাছের ঘেরের আইলে লাউ, কুমড়া, করলা, বরবটি, শসা, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঢেঁড়শ, পুঁইশাকসহ নানা ধরনের সবজি চাষ হচ্ছে। হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৯ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কৃষকেরা এ মৌসুমে চাষাবাদ করছেন। বিশেষ করে সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের তালা অংশে ঢুকতেই সড়কের দুই ধারে তাকালেই যতদূর চোখ যাবে দেখা যাবে শুধু মাছের ঘেরের আইলে সবজির সবুজ বিপ্লব।

উপজেলা ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৩৪০ হেক্টর জমির ঘেরের আইলে সবজি চাষ হয়েছে সদর উপজেলায়। এছাড়া তালায় ১৬৫ হেক্টর, কালীগঞ্জে ১৩৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ৮০ হেক্টর, শ্যামনগরে ৮০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৫৫ হেক্টর এবং দেবহাটায় ২০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ করা হয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, মাছের ঘেরের আইলে বাঁশ ও জালের সাহায্যে ঝুলন্ত মাচা তৈরি করে সবজি চাষ করা হয়। এতে একই জমিতে মাছ ও সবজি উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় কৃষকের আয় বাড়ছে। পাশাপাশি কম জায়গায় ও স্বল্প খরচে অধিক ফলন পাওয়ায় এ পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঘেরের চারপাশজুড়ে সবুজের সমারোহ। মাচায় ঝুলছে করলা, লাউ ও কুমড়া। আইলে রয়েছে ঢেঁড়শ, পুঁইশাক ও কলাগাছ। বর্ষাকালীন সবজির পাশাপাশি আগাম শীতকালীন সবজির চাষও শুরু করেছেন অনেক কৃষক।

তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামের ঘের মালিক ইসরাইল হোসেন জানান, ১৬ একর জমির ঘেরের তিন পাশে সবজি চাষে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। আবহাওয়া ও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার সবজি বিক্রির আশা করছেন তিনি। একই এলাকার আরেক ঘের ব্যবসায়ী মোহর আলী বলেন, এক একর জমির ঘেরের চারপাশে ডাবল সিস্টেমে মাচা তৈরি করে সবজি চাষ করেছেন। এতে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকার বেশি মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।

তালা উপজেলার মিঠাবাড়ী এলাকার কৃষক সুমন জানান, বর্তমানে এক কেজি করলা বিক্রি করে তারা পাচ্ছেন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। অথচ একই করলা পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে। আর খুচরা বাজারে সেই করলার দাম উঠছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত। তিনি বলেন, "আমরা মাঠে পরিশ্রম করে সবজি উৎপাদন করি। উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, মাচা তৈরি ও পরিবহন খরচ সবই আমাদের বহন করতে হয়। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি, আমাদের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে খুচরা দামের বিশাল পার্থক্য।" কৃষকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে সরাসরি পাইকার বা বড় বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকটা বাধ্য হয়েই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে সবজি বিক্রি করতে হয়। এতে উৎপাদনকারী কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, দেশে ও বিদেশে বিষমুক্ত সবজির চাহিদা বাড়ায় গত কয়েক বছরে ঘেরপাড়ে সবজি চাষে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। মাছের সঙ্গে সবজি উৎপাদনের এই সমন্বিত পদ্ধতি অনেক কৃষকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, জেলার অধিকাংশ ঘেরের পাড়ে এখন সবজি চাষ হচ্ছে। আগাম মৌসুমে উৎপাদিত লাউ, উচ্ছে, শসা ও বরবটি বাজারে আসতে শুরু করেছে। কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন এবং তাদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, "গত কয়েক বছরে ঘেরের আইলে সবজি চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। পদ্মা সেতুর কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত সবজি পরিবহন সম্ভব হচ্ছে, ফলে কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমেছে।" তিনি আরও বলেন, "সাতক্ষীরা চিংড়ির রাজধানী হিসেবে পরিচিত হলেও সবজি উৎপাদনেও জেলার সুনাম রয়েছে। জেলার মোট সবজি উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে মাছের ঘেরের আইল থেকে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন বাজার মনিটরিং জোরদার করবে এবং কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মাছ ও সবজি চাষের এই সমন্বিত পদ্ধতি শুধু কৃষকের আয়ই বাড়াচ্ছে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। সাতক্ষীরার মাছের ঘেরের আইলে এই সবুজ বিপ্লব এখন দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

Published১১ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

খবর পাঠান

আপনার এলাকার সংবাদ আমাদের পাঠান

এখনই পাঠান