সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা যেন বৈষম্যের শিকার না হন

যারা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার শপথ নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব। একজন পেশাদার সৈনিকের কাছে পদ-পদবি, ইউনিফর্ম কিংবা বেতন-ভাতার চেয়েও তাঁর আত্মসম্মান অনেক বেশি মূল্যবান। সেই সম্মানে যখন অন্যায়ভাবে আঘাত করা হয়, তখন শুধু একজন কর্মকর্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যায়, আহত হয় প্রতিষ্ঠানের মনোবল এবং চূড়ান্তভাবে ক্ষুণ্ণ হয় রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি।
বিগত দেড় দশকে (২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত) তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বৈষম্য, প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক অন্যায়ের শিকার হয়ে সশস্ত্র বাহিনীর বহু কর্মকর্তা বছরের পর বছর চরম অবহেলা ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কাটিয়েছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ১৫০ জন অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্ত কর্মকর্তার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নিয়েছে—তা নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনৈতিক পদক্ষেপ। তাঁদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বকেয়া আর্থিক সুবিধা এবং পুনর্বাসনের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি রুটিন প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন নয়; এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী বার্তা। অতীতে যাঁদের প্রতি অন্যায় হয়েছে, তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার নৈতিক দায় যে রাষ্ট্র এড়াতে পারে না—বর্তমান সরকারের এই সিদ্ধান্ত তারই প্রমাণ।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ভুল হতে পারে, সরকারও কখনো কখনো পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু একটি পরিপক্ব ও সভ্য রাষ্ট্রের মহত্ত্ব প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে অতীতের ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের সাহস দেখায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব জাতি নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ভুলগুলো চিহ্নিত করে তা সংশোধনের পথে হাঁটতে পেরেছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
হাসিনা রেজিমের গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল তীব্র মেরুকরণ, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের আবহে আবদ্ধ। সেই সময়ে প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, বৈষম্য এবং চরম প্রতিহিংসার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার অন্ধ মোহে সশস্ত্র বাহিনীর মতো একটি জাতীয় ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানকেও বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা হয়নি। এটি শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্ষতি ছিল না, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য ছিল এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।
একজন সেনা কর্মকর্তা তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি দিন অতিবাহিত করেন কঠোর শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। সীমান্তে, দুর্গম পাহাড়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিংবা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে তাঁরা দেশের পতাকাকে মর্যাদার সঙ্গে বহন করেন। সেই মানুষগুলোকেই যখন রাজনৈতিক বিবেচনা, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা কিংবা প্রশাসনিক সংকীর্ণতার কারণে প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তবে সেই ক্ষত কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত থাকে না; সেটি রাষ্ট্রের বুকে এক বড় ক্ষত তৈরি করে।
এই বাস্তবতায় সরকারের সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, তিন বাহিনীর সদর দপ্তর এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটির দীর্ঘ ও নিবিড় পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এটি তাৎক্ষণিক কোনো আবেগের ফসল নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে গৃহীত সুচিন্তিত পদক্ষেপ। এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
তবে এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় শক্তি কিন্তু বকেয়া অর্থনৈতিক সুবিধা নয়, এর প্রধান শক্তি হলো হারিয়ে যাওয়া 'মর্যাদা' ফিরিয়ে দেওয়া। অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়তো সময়ের ব্যবধানে কাটিয়ে ওঠা যায়, কিন্তু অন্যায়ভাবে লুণ্ঠিত সামাজিক ও পেশাদার সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। আজ যাঁরা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি বা প্রাপ্য স্বীকৃতি পেলেন, তাঁদের অনেকেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও গ্লানিময় সময় নীরবে পার করেছেন। তাঁদের সন্তানদের মনে হয়তো প্রতিনিয়ত প্রশ্ন জেগেছিল—“আমার বাবার অপরাধ কী ছিল?” সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত অন্তত সেই অবুঝ প্রশ্নের একটি নৈতিক ও সম্মানজনক উত্তর দিতে পেরেছে।
রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আস্থা গড়ে ওঠে মূলত ন্যায়বিচারের ভিত্তির ওপর। নাগরিকরা যখন দেখেন যে রাষ্ট্র অতীতের অন্যায় সংশোধনে আন্তরিক, তখন ব্যবস্থার প্রতি তাঁদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক আস্থা মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। কারণ জনআস্থা ছাড়া কোনো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না, আর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া একটি টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণ অসম্ভব।
তবে এই একটি পদক্ষেপেই আমাদের থেমে থাকলে চলবে না। অতীতের ভুল সংশোধনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য স্থায়ী ও কার্যকর আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে কোনো কর্মকর্তা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত মতাদর্শ কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের সমীকরণে বলী হবেন না; বরং কেবল যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা এবং পেশাগত সততার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবেন। সশস্ত্র বাহিনীর মতো সংবেদনশীল ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই নিরপেক্ষতার নীতি কঠোরভাবে বজায় রাখা অপরিহার্য।
বিভক্ত সমাজে প্রতিশোধের রাজনীতি কখনো শান্তি আনে না; বরং ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্তই আস্থা পুনর্গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পথ। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে অতীতের অন্যায়কে ধামাচাপা দেওয়া নয়, বরং নিরপেক্ষভাবে তার মূল্যায়ন ও প্রতিকার করতে হয়। যে রাষ্ট্র নিজের ভুল সংশোধন করতে জানে, সেই রাষ্ট্রই ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্ত ভিত নির্মাণ করতে পারে।
আজকের এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু ১৫০ জন কর্মকর্তার নয়; এটি তাঁদের পরিবার, সহকর্মী এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজ যদি আন্তরিক হয়, তবে ন্যায়ের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায় না।
সবচেয়ে বড় কথা, এই উদ্যোগকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। একে সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। তবেই এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা তখনই অর্থবহ হবে, যখন কোনো সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা কখনোই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বৈষম্যের শিকার হবেন না। একটি সভ্য রাষ্ট্রের মহত্ত্ব কেবল ক্ষমতা প্রদর্শনে নয়, মানুষের সম্মান ও ন্যায়বিচার রক্ষায়। সশস্ত্র বাহিনীর এই ১৫০ জন কর্মকর্তার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তটি তাই স্রেফ প্রশাসনিক কাগজ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের মানবিক চেতনা, ন্যায়বোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ।
লেখক পরিচিতি:
আহসান হাবিব বরুন একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক, সমসাময়িক বিষয়ের কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে নিয়মিত কলাম ও বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন লিখে আসছেন।
মন্তব্য করুন
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!