সম্পাদকীয়

সংকটের আবর্তে বাজেট: জনস্বার্থের সুরক্ষাই হোক মূল অগ্রাধিকার

বিশেষ প্রতিবেদক ৯ জুন, ২০২৬ এ ০৬:১০ PM ৫০২৪৯ জুন, ২০২৬
শেয়ার:
সংকটের আবর্তে বাজেট: জনস্বার্থের সুরক্ষাই হোক মূল অগ্রাধিকার

একটি দেশের জাতীয় বাজেট কেবলই আয়-ব্যয়ের বার্ষিক খতিয়ান নয়, বরং তা দেশের আপামর জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানদণ্ড নির্ধারণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দলিল। সম্প্রতি ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেটটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন সামষ্টিক অর্থনীতি এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

একদিকে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, সুদের উচ্চহার, ডলার সংকট এবং অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। এই কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঘোষিত বাজেটটি কতটা জনবান্ধব আর কতটা আমলাতান্ত্রিক হিসাব-নিকাশের মারপ্যাঁচ, তা নিয়ে স্বভাবতই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এবারের বাজেটে উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধির চটকদার কিছু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শুনতে আশাব্যঞ্জক হলেও বর্তমান বাজার ও বাস্তবতায় কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। বিশেষ করে, মূল্যস্ফীতির হারকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তার পেছনে সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর কর্মপরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সংসার চালানো যেখানে দায় হয়ে পড়েছে, সেখানে বাজেটে পরোক্ষ কর ও ভ্যাটের (VAT) পরিধি বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর আরও তীব্র চাপ সৃষ্টি করবে বলে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।

> 'দৈনিক হক কথা' সব সময় শোষিতের পক্ষে এবং শোষকের বিপক্ষে কথা বলে এসেছে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে মেগা প্রজেক্টের জৌলুস বাড়ানোর চেয়ে, এই মুহূর্তে মানুষের মুখে অন্ন জোগানো, বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই রাষ্ট্রের প্রধানতম ও প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত।

>

বাজেটেরআরেকটি বড় দুর্বলতা হলো রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা এবং বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘাটতি। এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও যদি সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে দেশীয় ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হবে। ফলশ্রুতিতে নতুন শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে এবং কর্মসংস্থানের পথ রুদ্ধ হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অন্যদিকে, খেলাপি ঋণ আদায়, অর্থ পাচার রোধ এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বাজেটে দৃশ্যমান কোনো কঠোর বা আপসহীন বার্তা না থাকাটা চরম হতাশাজনক। করের জাল বড় করার নামে সাধারণ সৎ ও ক্ষুদ্র করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে, বড় বড় করখেলাপি, কালো টাকার মালিক ও অর্থ পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনা আজ সময়ের দাবি।

একই সাথে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের মতো মৌলিক ও জীবনরক্ষাকারী জায়গাগুলোতে বরাদ্দ জিডিপির তুলনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক কম। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা খাতাকলমে কিছুটা বাড়ানো হলেও, মূল্যস্ফীতির এই বাজারে মাথাপিছু ভাতার যে পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বর্তমান বাজারদরের সাথে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অপ্রতুল।

আমরা মনে করি, বাজেট দলিল হিসেবে যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, তার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সৎ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক বাস্তবায়নের ওপর। মেগা প্রকল্পের অপচয় ও আড়ালে যেন মেগা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি না হয়, সেদিকে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি প্রয়োজন। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে যদি স্বস্তি না ফেরে, তবে কাগজের ওপর জিডিপির প্রবৃদ্ধির গ্রাফ যতই উর্ধ্বমুখী দেখানো হোক না কেন, তা আমজনতার কাছে কেবলই এক ফাঁকা আওয়াজ। সরকার আত্মতুষ্টির বৃত্ত থেকে বের হয়ে বাস্তবমুখী ও জনবান্ধব উপায়ে এই বাজেট সংশোধন ও বাস্তবায়ন করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক:

রুহুল আমিন সরকার

নির্বাহী সম্পাদক

দৈনিক হক কথা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

ট্যাগ:#সংকটের আবর্তে বাজেট#জনস্বার্থের সুরক্ষাই হোক#মূল অগ্রাধিকার#

মন্তব্য করুন

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

Published৯ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

খবর পাঠান

আপনার এলাকার সংবাদ আমাদের পাঠান

এখনই পাঠান