পঞ্চগড়: লাইসেন্স বিহীন প্যাথলজিতে লিভার পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে প্রতারণা

পঞ্চগড় জেলা শহরের মেডিকেয়ার ডায়াগনেস্টিক সেন্টার স্বাস্থ্য বিভাগের লাইসেন্স না নিয়ে লিভার পরীক্ষাসহ প্যাথলজি সেবা চালু করেছে। এতে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এই সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে আসা এক রোগী প্রতারণার শিকার হয়ে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির ভুয়া রিপোর্টে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে আসা রোগীরা। সেই সাথে স্থানীয়রা প্যাথলজি সেবা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে পঞ্চগড় জেলা শহরের পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের আনোয়ার প্লাজার মেডিকেয়ার ডায়াগনেস্টিক সেন্টারে। সাইদুজ্জামান রেজা (৪৩) নামে রোগীর লিভার পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে।
এদিকে, স্বাস্থ্য বিভাগ অভিযোগ পেয়ে প্যাথলজিটির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৯ আগস্ট (রবিবার) লিভার রোগে আক্রান্ত রোগী সাইদুজ্জামান রেজা পঞ্চগড় মকবুলার রহমান ডায়াবেটিক হাসপাতালে লিভার পরীক্ষা করান। সেখানে তাঁর লিভার এসজিপিটি পরীক্ষায় ১২৭ ইউএল শনাক্ত হয়। লিভারের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে আবারও এসজিপিটি পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই দিনই সাইদুজ্জামান রেজা মেডিকেয়ার ডায়াগনেস্টিক সেন্টারে এসজিপিটি পরীক্ষার জন্য রক্ত দেন, যেখানে রিপোর্টে মাত্র ২৬.৭ ইউএল পাওয়া যায়।
মকবুলার রহমান ডায়াবেটিক হাসপাতালের রিপোর্টের সাথে মেডিকেয়ার ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের রিপোর্টের বিশাল ব্যবধান দেখে সাইদুজ্জামান রেজার সন্দেহ হয়। পরে লিভারের সঠিক অবস্থা জানতে আবারও চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। এ সময় চিকিৎসক আবারও পরীক্ষা করার পরামর্শ দিলে পরদিন ১০ আগস্ট (সোমবার) তিনি পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে তৃতীয়বারের মতো এসজিপিটি পরীক্ষা করান। আধুনিক সদর হাসপাতালের রিপোর্টে এসজিপিটি ১২১ ইউএল পাওয়া যায়। এ নিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন মর্মে সাইদুজ্জামান রেজা মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে পঞ্চগড় সিভিল সার্জন বরাবর মেডিকেয়ার ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে মেডিকেয়ার সেন্টারের পরিচালক সৈয়দা নাসরিন মিনুর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে সাংবাদিকের কণ্ঠ শুনে উত্তেজিত হয়ে যান। এ সময় নিজেকে উচ্চপদস্থ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের আত্মীয় পরিচয় দেন এবং সাংবাদিকদের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। পরে তিনি দাবি করেন, তাঁদের ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের দেওয়া রিপোর্টে কোনো ভুল নেই।
এদিকে, অনুসন্ধান করে জানা গেছে, লিভার প্রদাহ শনাক্তের জন্য বর্তমানে ফুল অটোমেটিক মেশিন ব্যবহার করা হলেও মেডিকেয়ার সেন্টারে এখনো পুরোনো সেমি অটোমেটিক মেশিন দিয়েই পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেই সাথে ভুক্তভোগী রোগী সাইদুজ্জামান রেজার ডায়াবেটিক সমিতি ও মেডিকেয়ার সেন্টারে কর্মরত প্যাথলজি টেকনোলজিস্ট একই ব্যক্তি, যাঁর নাম আবুল বাশার। তিনি একজন ডিপ্লোমাধারী টেকনোলজিস্ট। একই টেকনোলজিস্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে কীভাবে দুই ধরনের রিপোর্ট প্রদান করেন— এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, প্যাথলজি রিপোর্টের গণ্ডগোলের কারণে চলতি বছরেই পঞ্চগড় মকবুলার ডায়াবেটিক সমিতি থেকে আবুল বাশার সাময়িক বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। বর্তমানে পঞ্চগড়ের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক খাতে একক আধিপত্য বিস্তার করছেন তিনি।
পঞ্চগড় সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান জানান, "মেডিকেয়ার সেন্টারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিযোগকারী রোগীর অন্যান্য হাসপাতালের রিপোর্টের তুলনায় মেডিকেয়ার সেন্টারের এসজিপিটি পরীক্ষার রিপোর্টটি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হচ্ছে না।"
মন্তব্য করুন
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!