সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের গণচেতনা : বার্ধক্যে বিলীয়মান সূর্যসন্তানদের প্রতি জাতির দায়

আফরোজা সরকার ১১ আগস্ট, ২০২৬ এ ০১:৫৫ PM ৩৩৩২১১ আগস্ট, ২০২৬
শেয়ার:
মুক্তিযুদ্ধের গণচেতনা : বার্ধক্যে বিলীয়মান সূর্যসন্তানদের প্রতি জাতির দায়

১৯৭১ সালে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক গোষ্ঠী বা একক শ্রেণির মানুষের হাতে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, জনতা—সব পেশা ও স্তরের আবালবৃদ্ধবনিতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। এটি ছিল এক খাঁটি গণযুদ্ধ।

সাড়ে সাত কোটি মানুষের ইস্পাতকঠিন ঐক্য, বিপুল ত্যাগ আর অসীম সাহসের বিনিময়ে বিশ্বমানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। যে রক্তিম পতাকার নিচে আজ আমরা স্বাধীন জীবনযাপন করছি, তার মূল কারিগর ছিলেন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। ১৯৭১ সালের ১৮ থেকে ২৫ বছরের একজন অকুতোভয় তরুণ আজ জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছেন। বার্ধক্যের প্রাকৃতিক নিয়মে প্রতিদিন আমাদের মাঝ থেকে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছেন একেকজন সূর্যসন্তান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় প্রতিদিনই ভেসে আসে কোনো না কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার চিরবিদায়ের খবর। জীবনের শেষ বয়সে এসে অনেকেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা, একাকীত্ব ও আর্থিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করছেন। রক্তমাংসের মানুষগুলো একে একে বিদায় নিচ্ছেন, আর তাঁদের সঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জীবন্ত দলিল।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই প্রস্থান কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়; এটি একটি অনন্য ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার রেষারেষিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন এবং তাঁদের উপযুক্ত সামাজিক অবস্থান নিশ্চিতকরণ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সম্মান ভাতা এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—কেবল সামান্য আর্থিক অনুদানই কি এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি জাতির শেষ দায় হতে পারে?

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ তিনটি:

পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও সামাজিক মর্যাদা: গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন। দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে তাঁদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসার স্থায়ী ব্যবস্থা করা জরুরি।

ইতিহাসের ডিজিটাল সংরক্ষণ: প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিকথা সংরক্ষণের সময় প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আগামী এক দশকের মধ্যে হয়তো এমন কাউকেই পাওয়া যাবে না, যিনি রণাঙ্গনের সরাসরি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে পারবেন। তাই অবিলম্বে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাত্কার ধারণ করে ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তুলতে হবে।

বিতর্কমুক্ত সঠিক তালিকা: রাজনৈতিক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে স্বচ্ছতার মাধ্যমে সর্বজনগ্রাহ্য একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিশ্চিত করা, যাতে অমুক্তিযোদ্ধারা বাদ পড়েন এবং প্রকৃত বীরেরা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান পান।

বীর মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের কাছে করুণার পাত্র নন; তাঁরা আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে জীবন বাজি রেখেছিলেন, যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য, শোষণ ও অবিচার। তাঁদের জীবন সায়াহ্নে এসে আমাদের পরম কর্তব্য হলো—তাঁদের শেষ দিনগুলোকে স্বস্তি, সম্মান ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশকে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ হিসেবে গড়ে তোলা।

আফরোজা সরকার

সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

মন্তব্য করুন

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

Published১১ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

খবর পাঠান

আপনার এলাকার সংবাদ আমাদের পাঠান

এখনই পাঠান