ক্যালেন্ডারের শেষ পাতা: সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়া আরেকটি বছর"

তারিখটা ২০ জুন। প্রতিবছর এই দিনটি ঘুরে ঘুরে আসে। মুঠোফোনে ভেসে ওঠে যান্ত্রিক শুভেচ্ছা বার্তা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জমে ওঠে শুভেচ্ছার পাহাড়। কেউ কেউ কেক কাটেন, মোমবাতির আলোয় রঙিন করে তোলেন চারপাশ। প্রচলিত সমাজ-সংস্কৃতির নিয়মে আজ আমারও ‘জন্মদিন’। কিন্তু একজন লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে জীবনের পৃষ্ঠাগুলো ওল্টাতে উল্টাতে আজ নিজেকে খুব বড় একটা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে ইচ্ছে করছে— জন্মদিন কি আসলেই আনন্দের কোনো উপলক্ষ?
অন্তত আমার জীবনদর্শন তা বলে না। আমি এই কৃত্রিম উৎসবের আলোয় নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারি না। কারণ, আমার ভাবনায় জন্মদিন মানে কোনো উল্লাস নয়; জন্মদিন মানে আমার জীবন-পঞ্জি থেকে আরও একটি মূল্যবান বছর চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।
> শৈশব বা কৈশোরে জন্মদিনের যে অবুঝ রোমাঞ্চ থাকে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা এক গম্ভীর ও নির্মম বাস্তবতায় রূপ নেয়। ক্যালেন্ডারের এই নির্দিষ্ট দিনটি আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাকালের গর্ভে আমরা আরও এক ধাপ পিছিয়ে গেলাম। জীবনের আয়ু নামক যে সংক্ষিপ্ত ও সীমিত পুঁজি নিয়ে আমরা পৃথিবীতে এসেছিলাম, সেখান থেকে নিঃশব্দে কেটে গেল ৩৬৫টি দিন।
>
এর চেয়ে বড় বাস্তব সত্য আর কী হতে পারে যে, এই দিনটি আমাদের প্রিয়জন, আপনজন এবং ভালোবাসার মানুষদের কাছ থেকে আমাদের একটু একটু করে দূরে সরিয়ে দেয়। প্রতিটি জন্মদিন যেন এক নীরব বিদায়ের ঘণ্টা। যে মানুষগুলোকে আমরা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই, যে চেনা মুখগুলোর মাঝে আমাদের প্রতিদিনের পথচলা, সময়ের এই অমোঘ ঘূর্ণিপাকে তাদের কাছ থেকেও আমরা এক বছর করে দূরে সরে যাচ্ছি। আমরা আসলে প্রতিদিন একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, আর আপনজনদের চেনা পরিধি থেকে হারিয়ে যাচ্ছি। সময়ের এই অদৃশ্য দূরত্বকে উৎসবের মোড়কে ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
তাই ২০ জুনের এই দিনে কোনো আনন্দ-উচ্ছ্বাস নয়, বরং এক ধরনের গভীর আত্মোপলব্ধি আমাকে গ্রাস করে। উৎসবের আলো নিভে যাওয়ার পর যে নিস্তব্ধতা থাকে, সেই নিস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে হিসাব মেলাতে ইচ্ছে করে— জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় কী হারালাম আর কী-ই বা রেখে গেলাম?
জন্মদিন মানেই আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়া নয়, বরং জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানের সংক্ষিপ্ত সেতুটিতে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকানোর এক নিঃসঙ্গ মুহূর্ত। আজ আমার জন্মদিনে সবার ভালোবাসা ও শুভেচ্ছার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আসুন উৎসবের ডামাডোলে জীবনের আসল সত্যটাকে ভুলে না যাই। একটি বছর হারিয়ে যাওয়ার এই হাহাকারকে বুকে ধারণ করেই যেন আমরা বাকি দিনগুলোতে মানুষের জন্য, সমাজের জন্য আরও বেশি অর্থপূর্ণ ও কল্যাণকর কিছু করে যেতে পারি।
ক্যালেন্ডারের পাতা ও একটি বছর হারানোর নীরব হাহাকার
লেখক:— রুহুল আমিন সরকার
লেখক, সাংবাদিক ও সমাজ সেবক
মন্তব্য করুন
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!