অর্থনীতি খুলনা

কৃষি-মৎস্য অর্থনীতির গতি ফেরাতে হচ্ছে ৪৫ কিলোমিটার খাল খনন

ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি ১৬ জুন, ২০২৬ এ ০৩:৩৬ PM ৬৬৬৫১৬ জুন, ২০২৬
শেয়ার:
কৃষি-মৎস্য অর্থনীতির গতি ফেরাতে হচ্ছে ৪৫ কিলোমিটার খাল খনন

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় কৃষির আধুনিকায়ন, মৎস্য চাষের সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘদিনের অভিশাপ ‘জলাবদ্ধতা’ নিরসনে ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে খাল খনন কর্মসূচি। ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ খালগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে হাজার হাজার একর ফসলি জমি আবাদের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে এই প্রকল্পের কাজ এখন পুরোদমে এগিয়ে চলছে।

সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা/কাবিটা) এবং এডিপিসহ সরকারের বিশেষ উন্নয়ন তহবিলের আওতায় এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ও মৃতপ্রায় প্রায় ৪৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রাথমিক ধাপে মোট ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে প্রতিটি খালের দৈর্ঘ্য ও পরিমাপ অনুযায়ী স্থানীয় উপকারভোগীদের সমন্বয়ে ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি’ (PIC) গঠন করে বরাদ্দ বণ্টন করা হয়েছে।

সরেজমিনে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে একাধিক মৃতপ্রায় খাল পুনঃখনন করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রুদ্রঘরা ও খর্ণিয়া ইউনিয়ন: এই অঞ্চলের জলবদ্ধতা দূর করতে প্রধান নিষ্কাশন খালগুলোর একটি বড় অংশের খনন কাজ ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

শোভনা ও গুটুদিয়া ইউনিয়ন: কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা দিতে এবং বর্ষায় পানি নিষ্কাশনের জন্য নকশা অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রশস্থতা বাড়ানো হচ্ছে। এখানে অগ্রগতি প্রায় ৬০ শতাংশ।

ডুমুরিয়া সদর ও ধামালিয়া ইউনিয়ন: মৎস্য চাষি ও সাধারণ কৃষকদের সুবিধার্থে খালের তলদেশের পলি অপসারণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।

সামগ্রিকভাবে উপজেলার চলতি মৌসুমের খাল খনন প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্ষা মৌসুম পুরোদমে শুরু হওয়ার আগেই কাজ শেষ করতে শ্রমিক ও এস্কেভেটর (ভেকু) দিনরাত কাজ করছে।

খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আজগার লবী বলেন, ‘ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কৃষি ও মৎস্য। দীর্ঘদিন ধরে পলি পড়ে খালগুলো ভরাট থাকায় কৃষকরা সময় মতো সেচ পেতেন না, আবার বর্ষায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। এই জনদুর্ভোগ দূর করতেই আমরা সরকারি বিশেষ তহবিল থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আমি নিজে কাজের তদারকি করছি। কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা ধীরগতি সহ্য করা হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টেকসইভাবে খাল খনন শেষ করে কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ সবিতা সরকার বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দ সঠিক নিয়মে এবং শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে খাল খনন নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আমরা নিয়মিত বিভিন্ন স্পটে গিয়ে কাজের পরিমাপ ও গভীরতা যাচাই করছি। যেখানেই নকশাবহির্ভূত কাজের অভিযোগ উঠছে, সেখানেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, এই খনন কাজ শেষ হলে ডুমুরিয়ার কৃষি ও পরিবেশগত ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।’

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডুমুরিয়া উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবদ্ধতা নিরসনে এই খাল খনন প্রকল্পগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা টেকনিক্যাল গাইডলাইন এবং প্রাক্কলন (এস্টিমেট) অনুযায়ী প্রতিটি খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা শতভাগ বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করার জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পিআইসি কমিটিকে সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে আমাদের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়মিত তদারকি করছেন। বরাদ্দের প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আমরা বদ্ধপরিকর।’

স্থানীয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই খালগুলো ছিল আমাদের এলাকার কৃষকদের প্রাণ। দীর্ঘদিন খনন না করায় এগুলো মরা খালে পরিণত হয়েছিল। বর্তমান সরকারের এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক বরাদ্দের ফলে আমাদের এলাকার হাজার হাজার কৃষক ও ঘের ব্যবসায়ী সরাসরি উপকৃত হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা সার্বক্ষণিক কাজের মান তদারকি করছি, যেন সাধারণ মানুষ এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল পায়।’

খাল খনন প্রকল্পের পিআইসি (প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি) বলেন, ‘আমরা শতভাগ নিয়ম মেনে শিডিউল ও বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ করছি। মাটির গভীরতা এবং খালের দুই পাড়ের বাঁধ টেকসই করার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা পাওয়ায় কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আশা করছি, সরকারি বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই আমরা সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে উপজেলা প্রশাসনের কাছে বুঝিয়ে দিতে পারব।’

স্থানীয় কৃষকরা জানায়, সরকারি অর্থায়নে খালগুলো খনন করার ফলে বর্ষা মৌসুমে যেমন অতিবৃষ্টির পানি সহজে নেমে যাবে, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে সেচ কাজের জন্য পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে। এতে ফসল উৎপাদন দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। উপজেলাজুড়ে এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে সম্পন্ন হলে ডুমুরিয়ার অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এএস/

ট্যাগ:#কৃষি-মৎস্য#অর্থনীতির গতি ফেরাতে হচ্ছে#৪৫ কিলোমিটার খাল খনন

মন্তব্য করুন

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

Published১৬ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

খবর পাঠান

আপনার এলাকার সংবাদ আমাদের পাঠান

এখনই পাঠান