হাওরে থইথই পানি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে নারীরা

চারদিকে থইথই পানি, আর তার মাঝখানে জরাজীর্ণ ভবনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। বেশ কিছু পিলারের পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে গেছে। যাতায়াতের জন্য কোনো সংযোগ সড়ক বা ঘাট নেই। বর্ষার দিনে ভবনটিতে পৌঁছানোর একমাত্র উপায়—নৌকা, সাঁতার কিংবা কোমরসমান পানি ভেঙে হাঁটা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের খাগালিয়া গ্রামের এই কমিউনিটি ক্লিনিকটি খাগালিয়াসহ আশপাশের চার গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের একমাত্র স্বাস্থ্যসেবার ভরসা। তবে বছরের চার থেকে পাঁচ মাস যখন হাওরে পানি জমে থাকে, তখন চিকিৎসাসেবা পাওয়ার বদলে ক্লিনিকমুখী হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বর্ষায় বাড়ছে ঝুঁকি ও পানির আতঙ্ক
শুকনো মৌসুমে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে যাতায়াত করা গেলেও বর্ষায় চিকিৎসাসেবা নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। রূপচাঁন বিবি (৭৫) নামের এক প্রবীণ নারী আক্ষেপ করে বলেন, "গত সপ্তাহে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ নিতে কোমরসমান পানি ভেঙে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। যাওয়ার সময় পানির নিচে কিছু একটা কামড় দেয়। তারপর থেকে পা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। সুস্থ হতে গিয়ে এখন নিজেই আধমরা।"
শুধু যাতায়াত নয়, পানিতে সাপের মারাত্মক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল বারেক (৫০) জানান, কয়েক দিন আগে নাতিকে নিয়ে ক্লিনিকে গিয়ে তিনি টেবিলের নিচে বিশাল সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকতে দেখেন। ভয়ে ওষুধ না নিয়েই তিনি ফিরে আসেন।
আমেনা বেগম নামের আরেক নারী জানান, পানির কারণে ইচ্ছে থাকলেও তারা নারীরা ক্লিনিকে আসতে পারেন না। ঘরে শিশুরা জ্বরে ভুগলেও রাস্তা না থাকায় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় গত বছর বর্ষায় প্রসব বেদনা উঠলে খাগালিয়া গ্রামের রাফিয়া বেগমকে (২৫) নৌকায় করে ১৫ কিলোমিটার দূরে উপজেলা সদরে নেওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। অল্পের জন্য মা ও শিশু রক্ষা পেলেও সেই আতঙ্ক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি গ্রামবাসী।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, আতঙ্কে স্বাস্থ্যকর্মীরাও
ক্লিনিকটিতে ২২ ধরনের প্রাথমিক ওষুধ ও সেবা দেওয়া হয়। প্রতিদিন একজন সিএইচসিপি এবং সপ্তাহে একদিন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা এখানে থাকেন। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৮০ জন রোগী এলেও বর্ষায় তা কমে ১০-২০ জনে নেমে এসেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ছাদ চুঁইয়ে ভেতরে পানি পড়ছে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ইঁদুরের ছোটাছুটি। বেলা ১১টার দিকে কয়েকজন নারীকে কোমরপানি পেরিয়ে এবং নৌকায় চড়ে ক্লিনিকে আসতে দেখা যায়।
ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মো. আরিফ রহমান বলেন, "কখনো নৌকা পাই, কখনো পাই না। না পেলে সাঁতরে আসতে হয়। সাপের ভয়ে ক্লিনিকে ঢোকার আগে লাঠি দিয়ে মেঝেতে শব্দ করতে হয়। এছাড়া ভবনটির পিলার ফেটে রড বের হয়ে গেছে, ছাদ দিয়ে পানি পড়ে ওষুধ ও গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নষ্ট হচ্ছে। এমন পরিবেশে কাজ করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ।"
নেই কোনো টেকসই সমাধান
১৯৯৮ সালে এই অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে উদ্যোগ নেয় সরকার এবং ২০১১ সালে স্থানীয় এক ব্যক্তির দান করা নিচু জমিতে ক্লিনিকটি নির্মিত হয়। তবে প্রতিষ্ঠার এক যুগ পার হলেও যাতায়াতের জন্য কোনো পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়নি।
ভলাকুট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রুবেল মিয়া জানান, রাস্তাটি নির্মাণের জন্য একাধিকবার প্রকল্প নেওয়া হলেও জমি নিচু হওয়ায় পরিষদের সীমিত বাজেটে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, "খাগালিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের ভৌগোলিক অবস্থানটি অত্যন্ত প্রতিকূল। বর্ষায় যাতায়াতের কষ্ট লাঘবে সেখানে একটি উঁচু পথ ও ভবনটি আরও উঁচুতে পুনর্নির্মাণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আপাতত সীমিত সম্পদের মধ্যেই আমাদের কর্মীরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।"
মন্তব্য করুন
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!