আন্তর্জাতিক

গাজায় ইসরায়েলের টার্গেটে এখন শিশুরা

আন্তাজিক ডেস্ক ২৫ জুন, ২০২৬ এ ০৫:১৮ PM ৭৫৭৫২৫ জুন, ২০২৬
শেয়ার:
গাজায় ইসরায়েলের টার্গেটে এখন শিশুরা

গাজায় ইসরায়লি হামলায় নিহত ৪ মাসের শিশু আহমেদ খলিল।

ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান গণহত্যায় ইসরায়েলি বাহিনী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শিশুদের টার্গেট করছে। গাজায় হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের একটি স্বাধীন অনুসন্ধান কমিশনের প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

গত মঙ্গলবার এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। কমিশন জানিয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে ফিলিস্তিনি শিশুরা নজিরবিহীন মৃত্যু, আঘাত ও মানসিক ট্রমার মুখোমুখি হচ্ছে। গত বছর এই কমিশন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল।

কমিশনের মতে, শিশুদের ইচ্ছা করে নিশানা করা একটি বড় প্রমাণ। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের একটি গণহত্যার উদ্দেশ্য ফুটে ওঠে। এমনকি গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।

অনুসন্ধান কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরলিধর বলেন, ‘২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরেও শিশুরা নিহত ও গুরুতর আহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনি শিশুদের সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা এবং যুদ্ধবিরতিকে ক্রমাগত উপেক্ষা করছে ইসরায়েল।

যুদ্ধবিরতির পরেও হামলা, নিশানায় শিশুরা

প্রতিবেদনে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ব্যাপক হামলা এবং মানবিক ও চিকিৎসা সহায়তা আটকে দেওয়ার ফলে ফিলিস্তিনি শিশুদের বেঁচে থাকা, স্বাস্থ্য ও বিকাশের ক্ষতি হচ্ছে।

হাসপাতাল, স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও প্রজনন কেন্দ্রগুলোতে ইসরায়েলি হামলার একটি নিয়মতান্ত্রিক চিত্র নথিবদ্ধ করেছে কমিশন। এর ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি গাজায় দুই বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শত্রুতা পুরোপুরি শেষ হয়নি, বরং কিছুটা কমেছে।

যুদ্ধবিরতির আট মাস পরেও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিন বিমান হামলা চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এতে ২৫০ জনেরও বেশি শিশুসহ এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

দখলদারি বাড়িয়েছে ইসরায়েল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার অধীনে গাজায় একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করার কথা ছিল। সেখান থেকে ইসরায়েলের ধীরে ধীরে সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল। কিন্তু ইসরায়েল উল্টো তাদের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইসরায়েলি বাহিনী এখন গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।

যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল প্রথমে মানচিত্রে একটি সাময়িক ‘হলুদ রেখা’ দিয়ে দখলে থাকা এলাকা চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু সেই রেখা ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরে গেছে। এর ফলে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিরা আরও ছোট জায়গায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মতে, এই রেখা অতিক্রম করা বাসিন্দাদের জন্য নিষিদ্ধ। রেখার কাছাকাছি আসার কারণে শত শত মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এখন আগের হলুদ রেখা ছাড়িয়ে নতুন জমি দখলের জন্য একটি ‘কমলা রেখা’ চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রেখা ক্রমাগত পরিবর্তনের কারণে ফিলিস্তিনিদের জন্য, বিশেষ করে শিশুদের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে যে এটি কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ।

পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বর্বরতা

প্রতিবেদনে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের পরিস্থিতির ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের দ্বারা ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা তীব্রভাবে বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। পশ্চিম তীরে শিশুদের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ এবং সম্মিলিতভাবে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা ভুলে গেল বিশ্ব?

ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেম-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ২৩৬ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। গাজা ও পশ্চিম তীর উভয় অঞ্চলেই শিশুদের ব্যাপকভাবে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক করার ঘটনা ঘটেছে। গাজার অনেক শিশুর খোঁজ এখনো মেলেনি।

দায় অস্বীকার ইসরায়েলের

তবে ইসরায়েল সরকার বরাবরের মতোই গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটির কর্মকর্তারা।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘আপত্তিকর প্রোপাগান্ডা’ বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন একে একটি ‘রাজনৈতিক রক্তপাত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, হামাসের অপরাধ আড়াল করে কমিশন আবারও ইসরায়েলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

তবে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলেছে, দখলদার শক্তির লঙ্ঘন বন্ধ করতে এবং এই অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা এই প্রতিবেদনে ফের প্রমাণিত হয়েছে।

অনুসন্ধান কমিশন ইসরায়েল সরকারকে গাজায় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কর্তৃক ওয়ান্টেড ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করতে, ইসরায়েলে অস্ত্র হস্তান্তর বন্ধ করতে এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও বসতিস্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে কমিশন।

ফিলিস্তিনের পক্ষে অবিচল সমর্থন ইরানের

ফিলিস্তিনি জনগণ ও তাদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি ইরানের অবিচল সমর্থনের প্রশংসা করেছে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। গত বুধবার ভোরে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য বাসেম নাইম এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে একটি টেলিফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়। ওই টেলিফোনালাপে হামাস নেতৃত্বের শুভেচ্ছা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কাছে পৌঁছে দেন বাসেম নাইম।

একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে পৌঁছানোর জন্য তেহরানকে অভিনন্দন জানান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের দৃঢ় অবস্থান ও প্রতিরোধেরও প্রশংসা করেন তিনি ।

এএস/

মন্তব্য করুন

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

Published২৫ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

খবর পাঠান

আপনার এলাকার সংবাদ আমাদের পাঠান

এখনই পাঠান