জাতীয়

দাম কমতে পারে ৬০ নিত্য ও কৃষিপণ্যে

নিজেস্ব প্রতিবেদক ১১ জুন, ২০২৬ এ ১১:০৩ AM ৮২৪৮১১ জুন, ২০২৬
শেয়ার:
দাম কমতে পারে ৬০ নিত্য ও কৃষিপণ্যে

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ৬০ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কৃষিপণ্যে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে বাজেটে। এসব পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাসের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনে এ কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।  জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তার জীবনের প্রথম বাজেট। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বিএনপি সরকারেরও প্রথম বাজেট এটি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন-ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হতে হ্রাস করে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি। বিগত বছরগুলোতে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পদক্ষেপ জনজীবনে স্বস্তি আনবে।

এছাড়া আমদানি করা শিশুখাদ্য প্রস্তুতিমূলক সামগ্রীর ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে (শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে)। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এতে বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমবে।

জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়া ইত্যাদি মসলায় ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দাম কমতে পারে। সোনা সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ভ্যাট ছিল আগে ৫ শতাংশ। ফলে আড়াই লাখ টাকার সোনায় ভ্যাট দাঁড়াত সাড়ে ১২ হাজার টাকা। এখন তা কমিয়ে ভরিপ্রতি আড়াই হাজার টাকা করা হয়েছে।

এছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রিক ভেহিকেলে (ইভি) নানা ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে এসব গাড়ির দাম অনেকটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়ার স্টেশন বসাতে ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জামে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ক্ষেত্রে করছাড় দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষে (বিআরটিএ) নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির অগ্রিম আয়করের পরিমাণ কমানো হয়েছে।

ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এর ফলে কিডনি রোগীর প্রতিবার ডায়ালাইসিস সেবায় ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমবে।

ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে নানা ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি–সুবিধা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরো প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। শুল্ককর কমানো এবং শুল্কায়ন মূল্যে পরিবর্তনের কারণে বিদেশী মাংস, প্রাণিখাদ্য, পয়েন্ট অব সেলস বা পিওস যন্ত্র, সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম, লিপস্টিক, ফেসওয়াশসহ বিভিন্ন প্রসাধন এবং আরও নানা পণ্যের দাম কমতে পারে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড়ের অংশ হিসেবে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ; শারিরিকভাবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য আমদানি করা ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস; উৎসে করের উচ্চ হারের কারণে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের সরবরাহ এখনো অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে বিধায় সরকার রাজস্ব পাচ্ছে না। এই ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক খাতে এনে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে মাত্র ০.৫ শতাংশে হ্রাস; পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতে ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক এবং ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে কর হার ৫ শতাংশ হতে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার; কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি এবং কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশে হ্রাস; স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ ও ২ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হাস; বিদ্যুৎ উৎপাদনকারির কাছে থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ৪ শতাংশ হতে ৩ শতাংশে হ্রাস; রিফাইনারি কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ১.৫ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হ্রাস; রিসাইকেল্ড পণ্য ও রিসাইক্লিং কাঁচামাল-এ করহার ৩ শতাংশ হতে ১ শতাংশে হাস; বিটিআরসি কর্তৃক প্রাপ্ত রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি বা চার্জ এর ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার; মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা-খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২ শতাংশ হতে ১০ শতাংশে হ্রাস; শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে অগ্রিম করের সাধারণ হার ৫ শতাংশ হতে ৪ শতাংশে হ্রাস; বিদেশি বিনিয়োগের স্বার্থে যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ অনিবাসি (non-resident) করদাতাকে পরিশোধ খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১৫ শতাংশ হতে ৭.৫ শতাংশে হ্রাস; বিমা খাতে রি-ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম বাবদ খরচ কমানোর স্বার্থে অনিবাসী করদাতাকে পরিশোধিত বীমা প্রিমিয়াম হতে উৎসে কর কর্তনের হার ১০ শতাংশ হতে ৫ শতাংশে হাস; শিল্পস্থাপনে বিনিয়োগের ব্যয় কমানোর স্বার্থে বিদেশি ঋণের সুদের উপর উৎসে করের হার ২০ শতাংশ হতে ১০ শতাংশে হ্রাস করার প্রস্তাব করছি। 

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিতব্য বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এটি মোট জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ১২ দশমিক ৬ শতাংশ)। সংশোধিত বাজেটে আকার প্রাক্কলন করা হয় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে এবারের বাজেটের আকার বাড়ছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।

সাধারণত বাজেট ঘোষণার পরে দেখা যায় কিছু পণ্য ও সেবার দামে পরিবর্তন আসে। গত বছরের চেয়ে এ বছর বাজেটের আকার বাড়লেও বেশ কিছু পণ্যে উৎস কর, শুল্ক, ভ্যাট ও সারচার্জ বাড়ানো হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে। আবার কিছু কিছু খাতে করছাড় ও ভর্তুকির ফলে দাম কমবে পণ্যের।

এবারের বাজেট বক্তৃতায় কোন খাতে কর বাড়ছে, কোথায় করছাড় দেওয়া হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে এর কী প্রভাব পড়তে পারে- সেদিকে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের নজর থাকবে।  
 

এএস/

ট্যাগ:#মূল্যস্ফীতি#নিত্যপণ্য#কৃষিপণ্য#বাজেট#বাজেট ২০২৬-২৭#

মন্তব্য করুন

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

Published১১ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

খবর পাঠান

আপনার এলাকার সংবাদ আমাদের পাঠান

এখনই পাঠান