জাতীয়

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে স্বস্তির নিঃশ্বাস: ইউনূস সরকারের ‘কালো অধ্যায়’ পেরিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের অভিযাত্রা

বিশেষ প্রতিবেদক ১৫ জুন, ২০২৬ এ ১০:৪৩ PM ২৮২৮১৫ জুন, ২০২৬
শেয়ার:
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে স্বস্তির নিঃশ্বাস:  ইউনূস সরকারের ‘কালো অধ্যায়’ পেরিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের অভিযাত্রা

একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার বেসরকারি খাত, যার পিঠে ভর করে গড়ে ওঠে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির মজবুত ভিত্তি। কিন্তু ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে আইনি সংস্কারের নামে নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নজিরবিহীন স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। তবে বিচারহীনভাবে সম্পদ অবরুদ্ধকরণ এবং উদ্যোক্তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলার সেই ‘অন্ধকার অধ্যায়’ পেরিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে দেশের আর্থিক খাত।

সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের পরে ইউনূস আমলের বিতর্কিত আইনি ধারাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে, দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার দূরদর্শী লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ‘থ্রি-আর’ কৌশল দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন বাঁক বদলের সূচনা করতে যাচ্ছে।

সরকারের লক্ষ্য, এই দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করা। ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে এই ৫ বছরেই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সমৃদ্ধ অর্থনীতির চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন-২০০৪’-এর যে সংশোধনী আনা হয়েছিল, আইন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ‘নিকৃষ্ট কালো আইন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। আদালতের মাধ্যমে দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী বিবেচনা করা আইনের শাসনের পরিপন্থি। অথচ, সংশোধিত আইনে ‘আন্ডার কাভার’ তদন্তের নামে কোনো রকম বিচার বা চার্জশিট ছাড়াই যেকোনো নাগরিক বা ব্যবসায়ীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তাৎক্ষণিক জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়।স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের মাধ্যমে ব্যবসা বন্ধ করার অবাধ সুযোগ তৈরি করা হয়।

সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ (অবাধ চলাফেরা ও দেশত্যাগের মৌলিক অধিকার) এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায় (দুদক বনাম জি বি হোসেন মামলা, ৭৪ ডিএলআর)—যেখানে বলা হয়েছিল শুধু মামলার অজুহাতে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া যাবে না—তা পুরোপুরি অমান্য করা হয়।

অর্থনীতির ওপর নেমে আসা আঘাতের খতিয়ান: ৫৫,০০০ কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ: দেশের প্রায় দেড় হাজার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও সাধারণ পেশাজীবীর ব্যাংক হিসাব এবং সম্পত্তি আকস্মিকভাবে ফ্রিজ বা ক্রোক করা হয়।

১,০০০ উদ্যোক্তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা: বিশ্বায়নের এই যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য যেখানে প্রতিনিয়ত বিদেশে যোগাযোগ করতে হয়, সেখানে এক হাজারেরও বেশি শিল্পপতির ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বহু চলমান বৈদেশিক চুক্তি বাতিল হয়ে যায়।

উৎপাদন বন্ধ ও লাখো মানুষের বেকারত্ব: পুঁজি ও মালিকের অনুপস্থিতিতে শত শত কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নতুন বিনিয়োগ তো দূরস্থ, উল্টো সচল থাকা কয়েক লাখ মানুষ চাকরি হারিয়ে চরম বেকারত্বের মুখে পড়েন।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ: যাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে, তারা চাইলেও ব্যাংকের নিয়মিত কিস্তি ও ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ একযোগে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো ঘটেনি।

কেবল দুর্বল ব্যাংকই নয়; দেশের প্রথম সারির ও সুশাসিত আর্থিক সূচকে থাকা সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক এবং বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

দুর্নীতি দমন ও অর্থ পাচার রোধে বৈশ্বিক আইনি কাঠামো কঠোর হলেও, পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক বা আধুনিক অর্থব্যবস্থায় আদালতের রায় ছাড়া ঢালাওভাবে ব্যবসা বন্ধের নজির নেই।

ঘুরে দাঁড়ানোর মহাপরিকল্পনা—সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশল: বিগত দেড় বছরের আইনি ও নীতিগত ঝড়ঝাপটা কাটিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এখন নতুন করে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক তথ্য জানাচ্ছে, দেশের অর্থনীতি তার সহজাত স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ দিয়ে বিদায়ী অর্থবছরে ৪.১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই ইতিবাচক ধারাকে ত্বরান্বিত করতে এবং দেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রায় নিয়ে যেতে এক যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা সাজিয়েছে নতুন সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন ধাপের একটি বিশেষ অর্থনৈতিক রূপরেখা উন্মোচন করতে যাচ্ছেন, যা সংক্ষেপে ‘থ্রি-আর’ (Three-R) কৌশল নামে অভিহিত। এই ‘থ্রি-আর’ কৌশলটি মূলত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি—এই তিন স্তরের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

কৌশলের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি হলো ‘রিকভারি’ বা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। বিগত আমলের বিতর্কিত আইনি গ্যাঁড়াকল ও ঢালাও ব্যাংক হিসাব জব্দের কারণে বেসরকারি খাতে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, আগামী ১২ মাসের মধ্যে তা সম্পূর্ণ দূর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে এই ধাপে। এর আওতায় সরকার অনতিবিলম্বে ব্যবসায়ীদের অবরুদ্ধ অ্যাকাউন্ট ও সম্পত্তি সচল করার প্রক্রিয়া দ্রুততর করবে, যাতে বাজারে বন্ধ হয়ে যাওয়া তারল্য প্রবাহ আবার স্বাভাবিক হয়।

একই সাথে, ব্যাংকিং খাতের চলমান অস্থিরতা কাটানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি শক্ত ‘স্ট্যাবিলাইজেশন’ বা স্থিতিশীলতা আনয়নই হবে এই প্রথম বছরের মূল চ্যালেঞ্জ।

প্রথম ধাপে স্থিতিশীলতা আসার পর, দ্বিতীয় ধাপে গুরুত্ব দেওয়া হবে ‘রিস্টোরেশন’ বা অর্থনীতির স্বাভাবিক কাঠামো ও গতি ফিরিয়ে আনার ওপর। বর্তমান সরকারের প্রথম তিন বছরের মধ্যে এই ধাপের কাজ সম্পন্ন করা হবে। এর মূল লক্ষ্য হবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো এবং বিগত দেড় বছরে আতঙ্কিত হয়ে যেসব দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছিলেন, তাদের পুনরায় বিনিয়োগে ফিরিয়ে আনা।

এই তিন বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করার জন্য বিশেষ নীতিগত সুবিধা ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে, যার সরাসরি সুফল হিসেবে দেশের বাজারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সংকুচিত হয়ে পড়া শ্রমবাজার আবার প্রাণ ফিরে পাবে।

‘থ্রি-আর’ কৌশলের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে দূরদর্শী ধাপ হলো ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন’ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে কাঠামোগত পুনর্গঠন। পাঁচ বছর মেয়াদি এই মহাপরিকল্পনাটি ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে। এই ধাপে দেশের সনাতন অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে আধুনিক, ডিজিটাল ও উৎপাদনমুখী করে গড়ে তোলা হবে।

এএস/

ট্যাগ:#অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে স্বস্তির নিঃশ্বাস#ইউনূস সরকারের#‘কালো অধ্যায়’ পেরিয়ে#ট্রিলিয়ন ডলারের অভিযাত্রা#

মন্তব্য করুন

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

Published১৫ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

খবর পাঠান

আপনার এলাকার সংবাদ আমাদের পাঠান

এখনই পাঠান